বাচ্চার মোবাইলে আসক্তি – দ্বায়ী আমরা

বাচ্চা ফোন ছাড়া খেলতে চায় না, খেতে চায় না। এ সমস্যা এখন কম বেশি প্রায় আমাদের সব বাবা মায়ের ই। এই সমস্যার গোড়ার দিকে যদি যাই, তাহলে প্রশ্ন আসে বাচ্চা ফোন চিনলো কিভাবে?  ও ভিডিও দেখা বা গেম খেলতে শিখলো কিভাবে?

উত্তর টা কিন্তু আমাদের সব বাবা মা’দের মনেই লুকিয়ে আছে। আমরাই কোন না কোন সময় বাচ্চাকে এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। বাচ্চা যখন আমাদের সাথে খেলার জন্য এগিয়ে আসে তখন দেখে বাবা বা মা ব্যস্ত আছে। তার সাথে গল্প করার সময় তাদের কৈ?

আমাদের আদুরে মন, বাচ্চাকে একলা না রেখে তাকে ধরিয়ে দিয়েছি এই আধুনিক রঙিন খেলনা। যা ছোট বড়, ছেলে বুড়ো সবার মন ভুলিয়ে রাখতে পারে।

এই মোবাইল আসক্তি থেকে বাচ্চাকে  বের করে আনার জন্য যখন আমরা প্রাণান্তকর চেষ্টা করছি, তখন সমাধান কিন্তু খুব ছোট কথাতেই লুকিয়ে আছে।

“আগে নিজে বেরিয়ে আসুন।“

পথ যেমন আপনি দেখিয়েছেন, তেমন আপনি আগে বেরিয়ে পথ তৈরি করে দিন। কঠিন তবে অসম্ভব নয়। স্মার্ট ফোন ছাড়া একটা রুটিন সাজিয়ে নিন। প্রয়োজনে যতটুকু ব্যবহার করতে হবে, সেটা যেন বাচ্চার সামনে না হয়।

আমি নিজেও চেষ্টা করে যাচ্ছি। সেই চেষ্টার কিছু ধাপ আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

·        বাচ্চার সাথে কথা বলুন- বাচ্চা যতই ছোট হোক না কেন, সে কিন্তু আপনার কথা শোনে। তারমতো করে বোঝে এবং সাড়া দেয়। আপনি তার সাথে গল্প করুন। দেখবেন সে কিন্তু অপেক্ষা করবে আপনার জন্য।

·        বাচ্চাকে সাথে নিয়ে কাজ করুন –  যে কাজ গুলো বাচ্চাকে নিয়ে করা যায়, সে কাজ গুলো সাথে নিয়ে করুন। তাতে অবশ্য কাজ আর শেষ হবে না, তবে বাচ্চার সাথে সময় টা খুব ভালো কাটবে।

·        বাচ্চার খেলার সাথী হয়ে যান- বাচ্চার সাথে খেলা করুন। যে খেলা তার পছন্দের অথবা নতুন কোন খেলা তার সামনে উপস্থাপন করুন। প্রথমে সে আগ্রহ দেখাবে না। আপনি তারপরও বারবার নিজের মতো খেলতে থাকুন। দেখবেন ও ঠিকই একসময় সাড়া দিচ্ছে।

·        বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান। তাকে খোলা জায়গায় ছূটে বেড়াতে দিন। গাছপালা, ফুল-পাখি এসব দেখান। বাচ্চাদের কে বাইরে নিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। এতে বাচ্চারা খুব মজা পায়।

·        মনোযোগ দিন বাচ্চাকে। বাচ্চারা মনোযোগ খুব পছন্দ করে। দেখবেন প্রায়ই তারা আপনার কথার মধ্যে ঢুকে পড়ে। নিজের মতো গল্প শুরু করে দেয়। কিছু একটা দেখাতে চায়। বিরক্ত হবেন না। ওকে মনোযোগ দিন। এটা বাচ্চার ব্যক্তিত্ব বোধ গড়ে তোলে।

·        বাচ্চার সামনে মোবাইলে ভিডিও দেখতে বা গেম খেলতে বসবেন না। এতে করে কখনোই বাচ্চাকে বোঝানো সম্ভব হবে না।

·        বই পড়ুন – বাচ্চাকে সাথে নিয়ে গল্পের বই পড়ুন। একটু অভিনয় করে, সুর গুলো বদলে দিয়ে।যেন সে আগ্রহ পায়।

 এছাড়াও বাবা বা মা হিসেবে আপনি অবশ্যই জানেন কোন কাজ আপনার বাচ্চার বেশি পছন্দের। সেই কাজ গুলো কে গুরুত্ব দিন। মোট কথা আপনারা নিজেরাই প্রয়োজন ছাড়া ফোনের ব্যবহার কমিয়ে দিন, নিজেদের কাজের রুটিন সাজিয়ে নিন। দেখবেন একসময় বাচ্চাও ধীরে ধীরে মানসিক ভাবে স্থির হবে।

এই বিষয় টা একদমই সহজ নয়। হয়তো ভাবছেন অসম্ভব। নিজেদের এত্তো এতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ, ঘরে বসে অফিস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন বাচ্চার জন্য। আবার ফোনও যদি না ব্যবহার করি তো চলবে কি করে!? আর নিজেরাও তো মানুষ। একটু অবসর তো আমারও দরকার! 

অবশ্যই এতে যুক্তি আছে। তবে একটা বিষয় কি,সন্তান বাবা-মায়ের লাইফ টাইম ইনভেস্টমেন্ট। এর থেকে আমরা কোন বেনিফিট আশা করি না। শুধু তার সুস্থতা, নিরাপত্তা আর হাসি মুখই আমাদের একমাত্র চাওয়া। এর জন্যই কিন্তু আমরা সাধ্যের অতিরিক্ত পাহাড় টাও বয়ে নেওয়ার কথা ভাবছি। আপনি যখন এতো কিছু করছেন, তখন একটু ভাবুন তো কি ওকে সব দিক থেকে ভালো ও সুস্থ রাখতে পারে? আপনি তো সেটাই করবেন তাই না! সন্তান কে একটু সময় দিন, দেখবেন অনেক টা স্থির হয়েছে আপনার সোনামণি।

এর সাথে নিজেদের মানসিকতাকে আরেকটু মজবুত করুন। এই যেমন, রেগে যাওয়া, অধৈর্য্য হয়ে পড়া। বাড়ি এলোমেলো হচ্ছে, দেয়াল নোংরা হচ্ছে বলে অধৈর্য্য পড়া এই বিষয় গুলোতে চিৎকার না করে নিজেকে সংবরণ করুন। বাচ্চার ঘরবাড়ি খুব গোছানো থাকা জরুরি নয়। খুব বেশি হলে ৪/৫ বছর, এর বেশি এই অবস্থা থাকবে না। এই ৪/৫ বছর সময় আর আপনার জীবনে ও ফিরবে না। ছোট্ট সোনামণি টা নিজেকে এক্সপ্লোর করার যে অবাধ স্বাধীনতা এই সময়ে পায় তা আর অন্য কোন সময় পাবে না। বাবুর এই সময় টা নষ্ট হতে দেবেন না।

আমিও চাই আমার বাচ্চাটা আসক্তি মুক্ত ভাবে বেড়ে উঠুক। এজন্য নিজের যতটা সাধ্য হয়, ততটা সময় ই তাকে দেই। আপনি ও চেষ্টা করুন না। বাচ্চা ফোনে র আসক্তি থেকে মুক্ত হবে কি হবে না, এটা পুরোটাই আপনার ওপর নির্ভর করছে। যদি ভাবেন ভালো ডাক্তার দেখাবো, অনেক বড় সাইক্যাটিস্ট কে দেখাবো। ঘর ভরে সুন্দর সুন্দর খেলনা কিনবো, তাহলেই হয়তো সব শুধরে যাবে। সমীকরণ টা কিন্তু এতোটা সরল না। টাকার থেকেও আরও একটা দামী জিনিস আছে, সেটা হলো সময়। যা টাকা দিয়ে কিনে পাওয়া যায় না। আর আপনার সন্তান কিন্তু আপনার কাছে “সময়” চায়।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *