৩৬ জুলাই, ২০২৪- একজন সাধারণ মানুষের চোখে স্বাধীনতা

৩৬ জুলাই বা ৫ আগস্ট, ২০২৪ নতুন করে স্বাধীন হয়েছি। দিনটি আমাদের অনেক মানুষের কাছেই ছিল  অনেক আকাঙ্খিত। কিন্তু, আমরা জানতাম না কবে এই দিন আসবে?  আদৌ কি আসবে? নাকি এই রকম আবদ্ধ আর শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থাতেই জীবনাবষাণ হবে?!

আবার, কখনও ভাবতাম, দিন তো একদিন বদল হবেই। কোন স্বৈরাচার শাসকই দুনিয়াতে স্থায়ী হয় নাই। এরও একদিন অবসান  হবে, তবে সেই দিন দেখার ভাগ্য কি আমাদের হবে? প্রায়ই মনে হতো ,আমি কি  আমার দেশকে ভালোবাসি?? দেশের জন্য আমার কাজ কি?

কেন বলছি স্বাধীন হয়েছি? আগে কি খুব পরাধীন ছিলাম? না খেয়ে, রোগে শোকে দিন কেটেছে?  দেশে কোন উন্নয়ন হয়নি? মানুষ তো এখন ঘরে ঘরে, বসে থেকে নেট পাচ্ছে, সাথে আরও কত রকমের সুযোগ সুবিধা, তাহলে সমস্যা কোথায় ছিল, যে বলছি দেশ স্বাধীন হয়েছে???

আসলে প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর সহ আরও কিছু বিশেষ দিন উৎযাপন করি আমরা। ১৫ বছর আগে ২০০৮ সালে যখন সদ্য গত হওয়া সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, তারপর থেকে আমরা ধীরে ধীরে অনেক অনুভূতি ই হারিয়ে ফেলতে থাকি। বিটিভি তে একসময় কুচকাওয়াজ এর অনুষ্ঠান দেখতাম ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরে। সেদিন বাড়িতে একটু স্পেশাল রান্না হতো। শুক্রবার দিন গুলো হতো সাপ্তাহিক ঈদের দিন। প্রায় সব শ্রেণি পেশার মানুষের কাছেই। নিজের বাড়ির রান্না প্রতিবেশির বাড়িতে পৌছে দিত এক রকম যত্ন নিয়ে। এই কথা গুলো বলার কারণ অনুন্নত সেই বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থা বোঝানোর জন্য।

এরপর শুরু হলো ব্যাপক সব উন্নতির ইতিহাস। আমরা পিলখানার হৃদয় বিদারক হত্যা কান্ডের সাক্ষী হলাম পুরো জাতি। সেই সময় খুব দ্রুত বিশেষ বিচার করে সাজা দেওয়া হলো। যার সর্বোচ্চ শাস্তি হলো ৫ বছরের কারাদণ্ড, ব্যস্!এরকম আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ইতিহাস, যেমন – শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম এর ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড। সাগর-রুণি সাংবাদিক দম্পতির হত্যা কান্ড। তাঁদের ছোট্ট ছেলেটা নাকি বাড়িতে আসা লোক গুলোকে চিনতো। কিন্তু,বিচার আজও হয়নি। ২০১৮ সালের “নিরাপদ সড়ক চাই” আন্দোলন পর্যন্ত দমে গেছে সরকারের রক্ত চক্ষুর দাপটে। সেদিন ও রাজপথ ভিজেছিল স্কুল ছাত্রদের রক্তে। কিন্তু, তারপর ও সড়ক নিরাপদ হয় নাই।

আমি কোন সচেতন নাগরিক নই। একদম ঘরের ভেতর আরামে পড়ে থাকা এক সাধারণ মানুষ। নিজের মেমোরি তে জমে থাকা বিচ্ছিন্ন ঘটনা গুলো লিখছি।

সেই ২০০৮ এর পর ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম সত্যি বলা বারণ। নিজের খারাপ লাগা প্রকাশ করা অপরাধ। ক্ষমতাসীন দল মানেই পৃথিবীর অসীম ক্ষমতার অধিকারী মানুষের গোষ্ঠী। তাদের বিনাশ প্রায় অসম্ভব। সাধারণ মানুষের মনেও ভয়ভীতি ঢুকতে আরম্ভ করেছিল। এছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোরও তেমন কিছু করার সাহস হয়নি।

পাশাপাশি উন্নতির খেশারত দিতে লাগামহীন দ্রব্যমূল্য সামাল দিতে হয়েছে। কিভাবে সংসার গুলো সামাল দিয়েছে তা আমি জানি না। দেখেছি বাবা-মা রা খুব অসহায় না হলে আর নিজেদের চিকিৎসা করায় না। শখ গুলো প্রায় নিঃশেষ, শুধুই প্রয়োজন বিবেচনা হয় সাংসারিক খরচে। তখন ছিলাম কিশোর বয়সে। বাড়ির কিছু আনন্দ আয়োজন যে ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল তা আমরা ৯০ দশকের সন্তানেরা খুব স্পষ্ট দেখেছি।

এরমাঝে আরেক টা বিষয়, যাদের বাড়িতে স্যাটেলাইট লাইন ছিলো না তাদের জন্য একুশে টিভি ছিল একটা বিনোদন এর মতো। কারণ,  বিটিভি তো শুধু সরকারের প্রশংসা করতো। যদিও বিটিভির রাত ১০ টার সংবাদ একটা বিশেষ সময় ছিল বাড়িতে। আর একুশে সরকারের ভালো মন্দ সব কিছু নয়েই আলোচনা করতো বেশ সমীহ করে। এজন্য একুশে টিভি বা অন্য বাংলা চ্যানেল গুলোর খবর শুনতে বেশ ভালো লাগতো। ২০০৮ সালের পর এই ভালো লাগাটা আর থাকলো না। সব বাংলা চ্যানেল বিটিভির কাজিন হয়ে গেল। দেশের সংবাদ দেখার আগ্রহ দিন দিন হারিয়ে গেল। 

আমাদের বাবা মা’য়েরা দল সমর্থন, রাজনৈতিক আলাপ এসব থেকে দূরে সরে গেল চুপচাপ। আমরা একটা অন্যতম ভীত জেনারেশন হয়ে বেড়ে উঠলাম। আমরা নিজেরাই সযত্নে রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা থেকে দূরে থাকতাম। কোথাও গন্ডগোল হচ্ছে শুনলে নিজেরাই ঘরে লুকিয়ে পড়তাম। অকারণে মামলা ,হত্যা, ক্রসফায়ার, গুম এই ঘটনা গুলো আমাদের ভীত মনোভাব কে জিয়িয়ে রেখেছে। এরমধ্যে তিন রকম শ্রেণি গঠিত হলো।

১. বিদেশগামী, দেশ ছেড়ে চলে গেল বা এখনও যাচ্ছে যেন স্বাধীন মনোভাব আর স্বস্তি নিয়ে বাঁচতে পারে।

২. স্বজনপ্রিতী, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সরকারি দল হলো জাতীয় স্বজন।এই আত্মীয় দলে ভিড়ে বিবেক বিসর্জন দিতে পারলে আর কোন ভাবনা নেই। উন্নয়নের বাতাসে তারা কোথায় থেকে কোথায় পৌঁছে গেল  তার হদিস আমরা খালি চোখে দেখতে পারি নাই।

৩. “আমরা”-যারা একেবারে দেশের সাধারণ সুখী নাগরিক হওয়ার প্রত্যাশায় দিন কাটাতে লাগলাম।

এই “আমরা” শ্রেণির মানুষ এর একান্ত অনুভূতিই আমার কথা।

৩০+ বয়সে এখনো ভোট দিতে পারি নাই। তাও যদি দেশে শান্তি থাকতো, নিরীহ গো বেচারা আমরা তাও মেনে নিতাম।

ছাত্র জীবন শেষ করে সরকারি চাকরির জন্য খুব একটা মরিয়া হয়ে পড়াশোনা করি নাই। কারণ, ভালো মেধা, অর্থ, আত্মীয় এবং অন্ধ ভক্তি কোনটাই আমার মধ্যে নাই। তাই প্রাইভেট জব আমার ভরসা।

ভাবতাম, যাই হোক অন্য কোন ভালো চাকরি তো জুটেই যাবে। কিন্তু সেখানেও পরিবেশ এমন যে, ইন্ডিয়ান বা অন্য দেশি রাই হবে এ দেশের হেড। দেশি মানুষেরা হুকুমের গোলাম মাত্র। বেতনের সাথে সংসার চালানোর হিসাব যেন ইনফিনিটি সরল। মানে শ্রম দিয়ে যাও দিয়ে যাও, ফলাফল মিলবে না।

  সামান্য চাওয়া পাওয়া নিয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছাও যে  এতো কঠিন পরিস্থিতি তে দাঁড় করাতে পারে, তা জানেন সম সাময়িক মধ্যবিত্ত পরিবারের সব মানুষেরা। বিশেষ করে যাদের ঘরে ছোট্ট বাচ্চা আছে, তাদের জন্য দিন আর রাত যেন সমান অন্ধকার। সুস্থ স্বাভাবিক ভাবেই আছি, কিন্তু তারপরও হাড়ে হাড়ে অনুভব করছি বেঁচে থাকার আকুতি কি? বাঁচার মতো বাঁচতে চাই, কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস নাই।

এখন ছাত্রদের মূল লক্ষ্য ফ্রিন্যান্সিং শেখা। দেশের বাইরে চলে যাওয়া। দেশে থেকে কিছু করতে চাওয়া মানে খলি হাত পা আর শূন্য ঞ্জান নিয়ে মঙ্গল অভিযানে যাওয়ার মতো পরিকল্পনা করা।

 তবে এটা কিন্তু সব পরিবারের কথা নয়। একদম সাধারণ মানুষ, যারা নিরিবিলি একটা জীবন কাটানোর কথা ভাবে তাদের কথা। অপর দিকে আত্মীয়তা রক্ষাকারীদের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। অভাব,অভিযোগ আর দূর্দশা কি জিনিস তা তারা জানে না। খুব করুণ বাস্তবতা হলো, অনেক মুক্তিযোদ্ধা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। বৃদ্ধ বয়সে নিদারুণ দুর্দশায় জীবন কাটিয়েছেন। কারণ, মুক্তিযোদ্ধা নামক গুরুত্বপূর্ণ সার্টিফিকেট তারা বানিয়ে নেন নাই। সচেতন নাগরিক যারা গর্তে বসে বা নিরাপদে থেকে দেশের খোঁজ খবর নিতেন যুদ্ধের সময় তারা সময় বুঝে এই দামী সার্টিফিকেট বানিয়ে নিয়েছিলেন অনেকেই।

এমন আরও অনেক ঘটনার সাক্ষী আমাদের দেশের মানুষ, যা বলে শেষ হবে না।

এইসব দিনের অবসান করবো, এটা আমাদের অলিক স্বপ্ন। তবে এই প্রজন্মের ছাত্ররা খেলার ছলেই দেখেছে ভিন্ন স্বপ্ন, এঁকেছ  অসামান্য পরিকল্পনা ।

এই ছাত্ররা  একদম খোলা বুকে, খালি হাতে রাস্তায় নেমে গেছে “কোটা সংস্কার” এর দাবিতে। সহপাঠী রা চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে। পশুর মতো ধরে নিয়ে যাচ্ছে। গুম করে দিচ্ছে। বাবার কোলে সন্তান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেল। জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা, ছাদে খেলতে থাকা শিশু, ঘরে নবজাতক কোলে নিয়ে বসে থাকা মা তাদের জীবন উৎসর্গ করে চলে গেছেন। তারপরও থেমে যায় নাই এই জেনারেশনের অসামান্য সাহসী ছেলে মেয়েরা। আবু সাইদ, মুগ্ধ, তানভীর, ফাইয়াজ সহ আরও নাম না জানা অগণিত ভাই- বোন রা জীবন দান করেছেন। এখনও অসংখ্য ছেলে মেয়ে হসপিটালে চিকিৎসাধীন। দুই একটা মৃত্যু খবর এখনও শোনা যাচ্ছে। হারিয়ে গেছে অনেকে। পরিবার জানে না তারা কোথায়???

এদের উছিলাতেই আল্লাহ আমাদের দেশে রহমতের বিস্ফোরণ দিয়েছেন। আর আমরা দ্বিতীয় বারের মতো স্বাধীন হয়েছি। স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি।  ভেবেছিলাম একটা সুস্থ পরিবেশ দেশে হয়তো আর আসবে না। মুক্ত বাতাস আর কি পাবো!??

এই  কাজ টাই করে দেখালো, এই সদ্য দাঁড়াতে শেখা প্রজন্ম টা। আমরা তো কবেই দমে গেছি, ভয়ে চুপ মেরে এক্সার অবস্থা। এই প্রজন্ম বেশির ভাগই ২০০৮ এ একদম শিশু অথবা সদ্যোজাত।  

Gen-z বা একদম একটা ভঙ্গুর জাতি বলা হতো যাদের, এদের বিবেক বুদ্ধি কম, কান্ড ঞ্জান নাই। এরা ঠিকঠাক কথাও বলতে পারে না।  এদের থেকে কারোই ভালো কোন আশা ছিল না। এরা কিছু করবে কে ভেবেছে?

এই Gen-Z এর অসিলাতেই আল্লাহ আমাদের দেশে একটা নতুন অধ্যায় এর সূচনা করলেন। যা নিয়ে আমরা প্রতিটি মানুষ অনেক আশাবাদী। এখনো অনেক সমস্যা আছে দেশে, তবে সমাধান অবশ্যই হবে ইনশাআল্লাহ। কারণ,  আমরা প্রতিটি মানুষ এখন অনেক সক্রিয় নিজ নিজ জায়গা থেকে। দূর্বল ভেঙ্গে পড়া মন টা হঠাৎ এতো আশার আলোয় ভরে উঠেছে, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। শুধু এতো টুকুই বলতে পারি, ৫ আগস্ট জীবনে যেন প্রথম একটা অস্বাভাবিক সুন্দর সূর্য দেখেছি। একটা মুক্ত বাতাস পেয়েছি আর মনে হয়েছে সত্যিই কোন দেনা পাওনা ছাড়াই দেশকে অনেক ভালোবাসি।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *