আমরা মানসিক অশান্তি কে কখনও বড় করে দেখি না। ভাবতে চাই না যে, এটা একটা মানুষের জন্য বড় ক্ষতি র কারণ হতে পারে। যখন ক্ষতির মুখে পড়ে, তখন হা হুতাশ করা ছাড়া অন্য কোন পথ থাকে না। একটু সতর্ক হলে, হয়তো এই বিপদ গুলো এড়ানো যেত। এই “হয়তো “ র জায়গা নিয়ে একটু সতর্কতা খুব প্রয়োজন।
মানসিক কষ্ট শুধু দুঃখ পেলেই আসে না। অনেক আনন্দের বিপরীতে ও লুকিয়ে থাকে মানসিক অবসাদ। যেমন, মাতৃত্ব অত্যন্ত আনন্দের এক অনুভূতি। দুনিয়ার কোন আনন্দ আর প্রাপ্তির সাথেই এর তুলনা চলে না। এই অমূল্য আনন্দের পিছনেও লুকিয়ে থাকে এক মানসিক অবসাদ। যা একজন নতুন মা কে বিদ্ধস্ত বা মানসিক ভাবে অসুস্থ করতে পারে। এই মানসিক অসুস্থতার নাম “ পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন”।
পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন কি?
এটি একজন নতুন মায়ের প্রসব পরবর্তী মানসিক অবস্থা, যার প্রভাব তার আচরণে পড়ে। যেমন – খুব দঃখ বোধ হওয়া, কান্না করা, বিরক্ত, উদ্দীগ্ন, অস্থিরতা, খাওয়া ও ঘুমের পরিবর্তন, অপরাধ বোধ ইত্যাদি বিষয় গুলো দেলহা যায় নবজাতকের মায়ের আচরণের মধ্যে।
কারণ?
পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন কেন হয়, এর নির্দিষ্ট কোন কারণ নেই।
একজন সন্তান কে জন্ম দেওয়ার সময়, একজন মা এর শরীরে নানা রকম হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে। সন্তান জন্মদানের ঘন্টা খানেকের মধ্যেই তা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে শুরু করে।
এরপর ও একজন মা কে জন্মদানের পর থেকেই সন্তানকে দুধপান করানো থেকে শুরু করে, তার প্রয়োজনীয় দেখভাল করতে হয়। এতে করে তার পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম ও খাওয়া দাওয়া র প্রয়োজন থাকলেও সে নিজের জন্য সব সময় তার ব্যবস্থা করতে পারে না।
এই অবস্থায় পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন আসার অনেক অনেক কারণ থাকতে পারে।
পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনের ক্ষতিকর দিক গুলো কি কি?
ডিপ্রেশন কম বেশি সব মানুষের মধ্যে ই জীবনের কোন না কোন ধাপে আসে। আমাদের দেশে আমরা এই বিষয়ে খুব উদাসীন। ব্যাপার টা এমন যে, এতো গুরুত্ব দেওয়ার কি আছে? পারিবারিক মহিলা সদস্য রা নিজেরা ও এই স্টেজ পার করেছেন, কিন্তু তারপরও বলবে যে “আমরা কি এমন সময় পার করি নাই?” “এটা নিয়ে এতো কথা বলার কিছু নাই”।
হতে পারে আপনিও এমন পরিস্থিতি র মধ্যে আছেন। জেনে নিন কি কি সমস্যা হতে পারে –
• খুব মন খারাপ থাকে, ভীষণ দঃখ বোধ হতে পারে।
• এর থেকে কান্নাকাটি র প্রবণতা হয়, ঘন ঘন কান্নাকাটি করতে পারেন।
• মনে হবে শরীরে কোন জোর শক্তি নেই, কোন কাজের এনার্জি পাবেন না।
• খাওয়ার প্রতি অনীহা।
• পরিবারের অন্য লোকজনের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়। যার ফলে অনেক সময় তাদের সাথে একটা দূরত্ব চলে আসে।
• স্বামী- স্ত্রীর সম্পর্কে ভুল বোঝার সৃষ্টি হয়।
• সব থেকে বেশি ক্ষতি হয় নবজাত শিশুর। কারণ, বাচ্চার সাথে মায়ের একটা মানসিক সম্পর্ক থাকে এবং এই সম্পর্ক ধরেই একটা শিশু মানসিক ভাবে বেড়ে ওঠে। মায়ের এই অস্থির মানসিক অবস্থার একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাচ্চার ওপর। তার। যা বাচ্চার জন্য ভালো নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে বাচ্চার মায়ের সাথে মানসিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে না পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনের ফলে।
• এছাড়াও মা এর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়।
• বেশি মারাত্মক অবস্থায় গেলে বাচ্চার ক্ষতি করার কথা ও ভাবতে পারে।
কোন সময় এই ডিপ্রেশন দেখা দেয়?
সন্তান জন্মদানের ১ সপ্তাহ থেকে ১ মাসের মধ্যে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ই এটি খুব বেশি প্রকট হয় না। আপনা আপনি ঠিক হয়ে যায়। তবে, খেয়াল রাখতে হবে নতুন মায়েদের প্রতি। যদি লক্ষণ গুলো গুরুতর মনে হয়, মনে হয় যে নবজাত মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিক হচ্ছে না, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
কি করতে পারি আমরা, একজন নবজাতকের পরিবার হিসেবে?
তেমন জটিল কিছুই না। শুধু তাকে মানসিক ভাবে সাপোর্ট দিন। গল্প করুন, কথা বলুন। কি নিয়ে সে উৎকন্ঠিত হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন।
স্বামীর ভূমিকা – নতুন বাচ্চার বাবা প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন এই ক্ষেত্রে। নবজাতকের সাথে সাথেই জন্ম হয় একজন নতুন মায়ের ।একটা বিষয় মনে রাখবেন, আপনার স্ত্রী কিন্তু বিয়ের পর থেকেই মা নয় বা আপনি ও বাবা নন। আপনারা দুজন ই একসাথে একটা নতুন পরিচয় প্রাপ্ত হয়েছেন। এসময় নতুন মা দূর্বল থাকেন, অসুস্থ থাকেন। তার কিছু ভুল হতেই পারে। সেটা নিয়ে কখনই তীর্যক কথা বা দোষারোপ করবেন না। বরং তাকে সাহায্য করুন। তার দূর্বলতা গুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করুন। তার সাথে গুল্প করুন। রাতে একটু ঘুমের সুযোগ করে দিন। দিনের বেলায় কখনো একটু বিশ্রামের সময় করে দিন বা তার নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুযোগ করে দিন। এক কথায়, মানসিক ভাবে আশ্বস্ত করুন, যে আপনি তার পাশে আছেন।
পরিবারের অন্য সদস্য’রা যা করতে পারেন –
• একটা বড় সমস্যা দেখা যায়, বাচ্চার মা কে একটা নতুন কিছু শেখাতে যেয়ে প্রায়ই তাকে ছোট করে কথা বলা হয়। যেমন – এমন করে বাচ্চা ধরছো কেন? এই সময় গোসল কেন? এমঅন করলে হবে? একি কথা? কিছুই তো জানো না! আমাদের সময় এমন করতাম না। ইত্যাদি ইত্যাদি কথা খুব স্বাভাবিক হলেও, যদি নবজাতকের মা পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন গ্রস্থ হয়ে থাকে, তাহলে এতেও খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ই সামান্য সহায়তা পেলেই একজন মা এই পরিস্থিতি খুব সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারে। তারপর ও যদি প্রকট লক্ষণ দেখা দেয়, আত্মহত্যা বা বাচ্চার ক্ষতি করার মতো মানসিকতা দেখা দেয় তো অনতিবিলম্বে চিকিৎসা করা প্রয়োজন।
একজন মা নিজের জন্য কি করতে পারেন –
ইংরেজি তে একটা প্রবাদ আছে, Self help, best help. কথাটা সর্বাবস্থায় সত্যি। মানসিক ব্যাধি একদিনে প্রকট আকার ধারণ করে না। দিনে দিনে বৃদ্ধি পায়। যখন প্রসূতি মা বুঝতে পারবেন যে আপনার মানসিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে এবং কেউ সেটা বুঝতে চাচ্ছে না বা পারছে না। তখন নিজেই নিজের যত্ন নিতে চেষ্টা করুন। বিষয় টা প্রথমে একটু কঠিন মনে হতে পারে, তবে শুরু করুন দেখবেন আপনি সফল হবেন। কিছু টিপস দিচ্ছি-
• নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুন – যদি মনে হয় আপনি ভালো মা না, ভালো যত্ন নিতে পারছেন না বাচ্চার তাহলে ভুল ভাবছেন। কখনওই পারফেক্ট হওয়ার চেষ্টা করবেন না। কেউ পারফেক্ট না। তবে কেউ ই আমরা মা হওয়ার হাল ছেড়ে দেই না। আপনি সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করছেন, এটাই যথেষ্ট।
• বাচ্চার ভালো মন্দ নিজে বোঝার চেষ্টা করুন – অমুক এটা বললো, তাই এড়া করছি। তমুক এভাবে সামলাতে বলেছে, তাই এভাবে সামলাচ্ছি। এই পরনির্ভরশীলতা বাদ দেবেন। উপদেশ, পরামর্শ সবাই দেবে। সেটাই স্বাভাবিক ভাববেন, তবে বাচ্চার জন্য কোনটা কল্যাণকর এই সিদ্ধান্ত টা শুধু নিজে বুঝে শুনে নিজেরা (বাচ্চার বাবা-মা) নিবেন। এতে করে মনে চাপ পড়বে কম।
• নিজেকে সুস্থ ও হাসি খুশি রাখুন- দিনে একটা নির্দিষ্ট সময় নিজের জন্য বের করে নিন। সেটা ১০ মিনিট থেকেই শুরু করতে পারেন। যখন একটু নিজের যত্ন নেবেন, নিজের পছন্দের কোন কাজ করবেন। এতে করে মনে জোর বাড়ে, মন হালকা লাগে। তবে অবশ্যই বাচ্চার প্রতি সতর্কতা রেখে।
• সাপোর্টিভ সার্কেল গড়ে তুলুন – আশেপাশে যদি কাউকে পান যে আপনার ই মতো সময় পার করছেন বা করেছেন। আপনার প্রতি আন্তরিক মনোভাব রাখে এমন কারও সাথে যোগাযোগ করুন। নিয়মিত কথা বলুন, পরামর্শ নিন। এতে মানসিক মনোবল বাড়তে সাহায্য করবে। সোশ্যাল মিডিয়া তে এখন অনেক গ্রুপ গড়ে উঠেছে গর্ভবতী মা ও সন্তান দের যত্ন বা মানসিক যত্ন এসব বিষয়ে। এই গ্রুপ গুলোতে জয়েন করতে পারেন।
• একলা চলো রে- সর্বশেষ উপদেশ। নিজেকে কখনও ই দূর্বল ভাববেন না এবং নিজের ভেতর দূর্বলতা রাখবেন না। কারও মুখাপেক্ষী হয়ে এতো টা থাকবেন না যে কোন বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকি হতে পারে। যে মূহুর্ত থেকে আপনি মা হয়েছেন, তখন থেকে আপনার উপর একটা ছোট্ট জীবন সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এবং আপনি তো তাকে কোন অবস্থাতেই বিপদে ফেলতে পারেন না।
তাই নিজের বিষয় গুলো সম্পর্কে অনেক সচেতন থাকবেন এবং নিজের ভালো র জন্য যা করণীয় মনে হবে সে বিষয়ে প্রয়োজনে নিজেই প্রথম পদক্ষেপ নিবেন।
উপসংহার – একজন মা কে হতে হয় একটা বড় গাছের মতো। এই পুরো জার্নিতে কখনও পাশে অনেকেই পাবেন, কখনও হয়তো একলা থাকবেন। তাতে পথ থেমে যায় না। আপনি নিজেই জানেন আপনার পথ কতটা। এজন্য মনে জোর রাখার কোন বিকল্প নেই। এই টিকে থাকার চর্চা যতটা যত্ন নেওয়ার মধ্যে, তার থেকে অনেক বেশি মানসিক ভাবে ।
সর্বাত্মক সুস্থতা কামনা করছি সকল নবজাতক এবং নতুন মায়েদের।

