বাচ্চা আমার খায় না, খেতে চায় না, কিচ্ছু মুখে দেয় না। এই কথা গুলা কম বেশি সব মায়েদের ই খুব কমন। আমি নিজেও ভুক্তভোগী। একটা নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর এখন বিষয় টা সহজ ও স্বাভাবিক মনে হয়।
বাচ্চা কি করলে খাবে? এর উত্তর পুরোপুরি না জানলেও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বেশ কিছু বিষয় আপনাদের জানাতে পারি।
বাচ্চা কেন খায় না?
আমার বাচ্চার জন্য যে শিশু বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নেই, তিনি বলেছিলেন –“বাচ্চা ৬ মাস থেকে ৮ মাস বয়স পর্যন্ত যে কোন খাবার খুব আগ্রহ নিয়ে খাবে। এরপর আর খেতে চাইবে না। প্রায় ২ বছর বয়স পর্যন্ত এই আচরণ থাকবে। তারপর ধীরে ধীরে আবার ঠিক হবে।“
আমার বাচ্চার ক্ষেত্রে কথার মিল পেয়েছি। ব্যতিক্রম বাচ্চাও আছে। অনেক বাচ্চা আলহামদুলিল্লাহ বেশ সুন্দর আগ্রহ নিয়ে খায়। কিছু বাচ্চা প্রয়োজন মতো খায় আবার খায় না। কারও কারও বাচ্চা শুনেছি ২+ বয়স, শুধু দুধের ওপর ই থাকে। কোন কোন বাচ্চা ২/১ টা সিলেক্টিভ খাবারের ওপর ই থাকে সব সময়। আসলে এ সব লিখে শেষ করার মতো না।
আমার ধারণা আমার বাচ্চা বেশ ঝামেলা করা বাচ্চা গুলোর মধ্যে অন্যতম। ক্ষুধা লাগবে, তারপর ও খাবার পছন্দ না হলে সে খাবে না। প্রথম দেখায় নতুন কোন খাবার মুখে দেবে না। এজন্য এখন পর্যন্ত সে সব খাবার খায় না। নিজের পছন্দের বাইরে কোন খাবারের প্রতি তার আগ্রহ নেই। ওকে নিয়মিত খাবার খেতে ট্রেইন করাতে যে নিয়ম গুলো অনুসরণ করেছি তাই তুলে ধরছি।
প্রথমে ডাক্তারের শরণাপন্ন হই এবং দেখি এই একই কথা অনেক বাবা মা ই বলছেন।
ডাক্তার আমাকে বললেন-
• খাবার আগে যদি দুধ খেয়ে নেয়, তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই তার ক্ষুধা চলে যাবে। তখন সে খাবে না। পরে ট্রাই করবেন।
• একবার খাওয়ানো র পর ৪/৬ ঘন্টা খাবার সাধবেন না। যদি না তার ক্ষুধা লাগে। যখন বুঝবেন ক্ষুধা লেগেছে বা ৪ ঘন্টা পর আবার খাবার দেবেন। আগ্রহ দেখালে খাওয়াবেন, নয়তো অপেক্ষা করবেন।
• বাচ্চা যদি সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকে তাহলে সে অবশ্যই খাওয়া দাওয়া করবে। তার নিজস্ব নিয়মে খাবে। আপনাকে বুঝতে হবে সে কিভাবে খেতে চায় বা কি খেতে চায়।
• ক্ষুধা লাগার পূর্ব শর্ত খেলাধুলা করা। বাচ্চাকে যথেষ্ট খেলাধুলা করার সুযোগ দিন। তার আগ্রহ ও সাধ্যমতো ছোটাছুটি, লাফালাফি করে খেলতে দিন। দেখবেন সে খাওয়ার প্রতি আগ্রহ দেখাবে।
• ভাত খাওয়া নিয়ে খুব বেশি জোরাজোরি করতে মানা করেছিলেন। বলেছিলেন ভাত সে ২ চামচ খেলেও যা, ১ বাটি খেলেও তা। চেষ্টা করবেন মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, সবজি এবং কিছু ফল যেন তার খাবারের তালিকায় থাকে।
আমি যা করা শুরু করলাম-
এই কথা গুলো শুনে আসার পর প্রথমে আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে বাচ্চা আমার সুস্থ। তারপর যা করলাম, একবার খাওয়ানো র পর ৪/৬ ঘন্টা আর ভাবতাম না। যা মন চায় করুক। এতে করে মনে হয় কাজ হওয়া শুরু হলো। ওর মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া ভাব টা একটু কমলো। দিনে অন্তত ২ বার খেতে শুরু করলো।
আমার একটা ভুল ছিল, বার বার খাবার সামনে নিয়ে যেতাম। মনে করতাম, ও তো কিছুই খেলো না, তাহলে অন্য কিছু বানিয়ে নিয়ে আসি। কিছু ইউটিউব ভিডিও তে দেখেছিলাম ২ ঘন্টা অন্তর অন্তর বাচ্চাকে খাবার দিন। অনেক বাচ্চা খায় ও। কিন্তু, আমার বাচ্চার ক্ষেত্রে এটা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটা আমার ভুল ছিল,পরে বুঝতে পারি।
পছন্দের খাবার – বাচ্চা যে খাবার পছন্দ করছে, যে ধরনের খাবার পছন্দ করে তা খুঁজে বের করলাম। তারপর সে ধরনের খাবার গুলো তাকে দেওয়া শুরু করলাম।
নতুন নতুন পদের রান্না গুলো বাদ দিয়ে, নিয়মিত ঘরে যে খাবার গুলো আমরা খাই সেগুলো ই ওকে দিতে শুরু করলাম। তবে হালকা করে রান্না করে দেওয়া হতো। মাছ, মাংস আলাদা করে রান্না করা হতো, অনেক সময় সবজি ও শুধু বাবুর জন্য নরম ও হালকা করে রান্না করতাম। যেন ও খেয়ে মজা পায়। স্বাদ বুঝতে পারে। সাথে খিচুড়ি তো ছিলই। তবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর ও আর খিচুড়ি খেতে চাইতো না। এখনও সে আর খিচুড়ি পছন্দ করে না।
এরপর সে নিয়মিত খেতে শুরু করলো?
না। সব দিন একরকম ভাবে খাওয়া দাওয়া করতো না। আমি খাবার সময় হলে ওর সামনে খাবার নিয়ে যাই। ক্ষুধা আছে, কিন্তু খাচ্ছে না বুঝলে খাবার পরিবর্তন করে দিতাম। অনেক সময় এতে কাজ হতো। এভাবেই ধীরে ধীরে দেখলাম ওর খাবার প্রতি বিরক্ত ভাব টা দূর হতে শুরু করলো।
দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় সে কিছু না কিছু খায়। এখন, আলহামদুলিল্লাহ তার খাওয়া দাওয়া একটা রুটিনে এসেছে। সে খাবার সময় হলে খেতে বসে। প্রয়োজন মতো খায়।
খেতে না চাইলে জোর নেই। যখন ক্ষুধা লাগে ও নিজে থেকে খাবার কথা বলে। এটাই যথেষ্ট।
বাচ্চা তো এমনিতেই খাবার খাওয়া শিখে যাবে একটা সময় পর। তাহলে এতো চেষ্টা র দরকার আছে কি?
কিছুটা দরকার আছে। বাচ্চাকে যদি বাচ্চার মতো ছেড়ে দেন, তাহলে সে তো নিজের ভালো মন্দ বুঝে খাওয়া শিখবে না।
আন্ডার ওয়েট, দূর্বলতা ,পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি সমস্যা গুলো এখন প্রায়ই শোনা যায়। কেন হয়, তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারবে না। আর শুধু বাচ্চাকালেই না। এই অসুবিধা থেকে গেলে পরবর্তীতে বাচ্চা যখন বড় হবে, তখনও তার মাঝে কিছু সমস্যা থেকেই যায়। যেমন – গ্যাস ফর্ম করা, অ্যাসিডিটি, বাড়ির খাবারের প্রতি অনীহা, ইত্যাদি। এজন্য বাচ্চাকে নির্দিষ্ট সময় খাবার খেতে বসা এবং বাড়ির রান্না করা খাবারের প্রতি অভ্যস্ত করা টা খুব জরুরি।
আমার বাচ্চার খেতে না চাওয়ার বিরুদ্ধে আমার যা উপলব্ধি আর যা যা করেছি তার সারমর্ম তুলে ধরলাম। আশা করি নতুন মা দের একটু হলেও কাজে আসবে।

