বিয়ে: শুধু ভালোবাসা নয়, চাই বোঝাপড়ার বন্ধন!

ভালোবাসার মাস ফ্লাগুন বা ফেব্রুয়ারি। এই মাস আসলে যুগল / অযুগল সবার মনেই এক রকম বাসন্তি হাওয়া ছুঁয়ে যায়। কেউ ভাবে কি করবো! কি করা যায়? আর কেউ হয়তো ভাবে, একটা  সময় আমিও এমন তরুণ ছিলাম। সময় টা আমাদের ছিল।

যুগল / অযুগলের প্রসঙ্গ যখন আসে, খুব স্বাভাবিক ভাবে মনে আসে  জীবন সঙ্গী টা কি তুমিই হবে? এমন প্রশ্ন কি আপনার মনেও চলছে? নিজের বর্তমান  সময়ে যে সঙ্গী আছে তার সাথে কি বাকি জীবন টা কাটাবো? সিদ্ধান্ত তো অবশ্যই আপনার। তবে আমরা চেষ্টা করব ছোট ছোট কিছু বিষয় তুলে ধরতে, যেন আপনার সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হয়।

ভাবনার প্রথম ধাপেই একটা প্রশ্ন থাকতে পড়ে, বিয়ে কেন করব ?

এই বিষয়ে প্রথমে কথা বলা যাক।একাকি জীবন অনেক আনন্দের, মজার। যারা নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন, তাদের কাছে একাকি জীবন ভীষণ উপভোগ্য।  কোন জবাবদিহি তা নেই। ধরা বাঁধা রুটিনে খাপ খাওয়ানো র ভাবনা নেই। নিজের ভালো লাগা,মন্দ লাগার ওপর অন্য কারো দখল নেই। সত্যি বলতে এরকম একটা জীবন আমরা সবাই চাই। তবে আটকায় কোথায়?

আটকায় একটা নির্দিষ্ট সময় পর। শরীরের শক্তি, মনের জোর সব সময় একরকম থাকে না। আপনি যদি সুস্থ সামাজিক জীবন  যাপন করতে চান, তাহলে সব সময় আনন্দ নিয়ে থাকতে পারবেন না। কিছুটা দায়িত্ব, নিজের কাজ এসব কিছুই আপনার জীবনের অংশ হবে। বিভিন্ন পরিস্থিতি-জটিলতায় যখন ক্লান্ত লাগবে,  তখন মন চাইবে কেউ একজন পাশে থাকুক। যার সামনে মন খারাপ করে বসে থাকা যায়। সে জানতে চাইবে, “ কি হলো!  মন খারাপ তোমার?” এই টুকু অন্তত দরকার। হঠাৎ দুই এক দিন ফিরতে দেরি হলে কেউ একজন খোঁজ নেবে। রাত বিরাতে জ্বর হলে, কেউ পানির গ্লাস এগিয়ে দেবে বা কপালে হাত রাখবে। একটা সময় এই যত্ন গুলো র প্রয়োজন পড়ে। তা সে মেয়ে হোক,কি ছেলে? জীবন সঙ্গী এমন হওয়া দরকার।

এই দরকার এর জন্যই হয়তো বিয়ে করা দরকার। তবে অবশ্যই এতে তাড়াহুড়া বা বাড়াবাড়ি করবেন না।

তুমিই কি সেই?

না, মোটেই না।সে কতটা আপনার জন্য পারফেক্ট ,তা সময় বলে দেবে। সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। যদি কখনও মনে হয়, দুই দিক থেকেই সব ঠিক। সামান্য কিছু কিন্তু আছে। বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।

এটা ঠিক না।

আপনার জীবনে অনেক “তুমি” র ই আগমন ঘটেছে। সময় যত দিবেন, আনাগোনা থেকেই যাবে। এটাকে নির্দিষ্ট করার জন্য, একটা সময় দরকার, নিজেদের মাঝে বোঝাপড়া দরকার। এই সময় টুকুতে আমার মনে হয় বাড়াবাড়ি করতে নেই। এই বিষয়ে আবেগ কাজ করে, তবে কঠিন কথা হলো আবেগ কে বাদ রেখে যদি বাকি সব দিক ভাবতে পারেন তাহলে হয়তো একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

ভালোবাসা ছাড়া বিয়ে?

অবশ্যই তা নয় আবার অনেক টা, হ্যাঁ তাই। এটা যার জন্য যেটা ঠিক। আপনার জন্য যদি সত্যিই  ভালোবাসা থেকে থাকে, তাহলে সেই সম্পর্ক কে স্থায়ী করতে আপনাদের খুব বেশি ভাবতে হবে না। কিন্তু, যদি সে রকম কোন সম্পর্ক আপনার না থাকে, আবার সময়ের প্রয়োজনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে কি করবেন?

অনেক দিন আগে একজন মায়ের লেখাতে পড়েছিলাম। তার ছেলে তাকে বলেছিল, “ মা, love can grow”। পরে বড় হতে হতে আমিও বুঝেছি, Love can grow. মানে, সব সময় ভালোবাসা নিয়েই পথ চলতে হবে, এমন টা জরুরি নয়। কারণ, ভালোবাসা এমন এক অনুভূতি, যা সামান্য অযত্ন পেলে একদম নষ্ট হয়ে যায়।

তাই কোন পরিচিত সম্পর্ক ছাড়া বিয়ের জন্য দাঁড়িয়ে তিনটি বিষয় খুঁজে দেখুন। বিশ্বস্ততা, সম্মান আর যত্ন। এই তিন বিষয় যদি কারও মাঝে অনুভব করেন, তাহলে আমার বিশ্বাস আপনি তার সাথে পথ চলা শুরু করতে পারেন।

একটু বিশ্লেষণ করবো কি?

ধরছি এই মূহুর্তে পারিবারিক ভাবে বা নিজ উদ্যোগে আপনি বিয়ে করতে যাচ্ছেন। যে যে বিষয় গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন, তার মধ্যে রাখবেন বিশ্বাস।

কারণ, সঙ্গীর  বিশ্বস্ততা  খুব জরুরি। একজন আরেক জনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা সংসার জীবনে শান্তির অন্যতম চাবি। সে আপনাকে মিথ্যা বলবে না, কোন বিষয় গোপন করবে না, অন্য কোন সম্পর্কে জড়িত থাকার মতো মানসিকতা রাখবে না। সংসারের অর্থনীতি ও অন্যান্য যে কোন বিষয়ে নিজেরা নিজেদের নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।

এজন্য অবশ্যই আপনার নিজেকেও তার প্রতি একই রকম বিশ্বস্ত মনোভাব রাখতে হবে।

২. বলেছিলাম “সম্মান”। এই বিষয় ও ঠিক ততোটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা একজন ছেলে বা মেয়ের সুন্দর মানসিকতার  হওয়া জরুরি। 

সব বিষয়ে আপনি বা সে সমান দক্ষ হবেন না। দুইজন দুইজনের সব কিছুই পছন্দ করতে পারবেন না। কিছু বিষয়ে কোনদিন একমত হতে পারবেন না। তা বলে কি সব আলাদা হয়ে যাবে? সুযোগ পেলেই একজন আরেকজন কে হেনস্তা করবেন?  আত্মীয় স্বজন বা ঘর ভরা মানুষের সামনে তিরস্কার করবেন?!

কখনও না। বরং একজন আরেকজনের গোপনীয়তা রক্ষা করে চলবেন। তার সম্মানের বিষয় টা সবার আগে অগ্রাধিকার দেবেন,একই ভাবে সেও যেন আপনাকে সম্মান দেয়। সে যেন আপনার কারণে কখনও নিজেকে হীন মনে না করে, এই কম্ফোর্ট জোন টা তার জন্য আপনার বানানো দরকার। একই ভাবে সেও আপনার জন্য বানাবে। এই বিষয় আপনাদের পরস্পরকে নিজেদের সাথে বসবাস করতে আগ্রহী করবে।

৩. “যত্ন” পুরনো একটা কথা আছে, যতনে রতন মেলে। বিষয় টা কিন্তু, শুধুই প্রবাদ নয়।  ধরুন একটা রুমাল, একটা ছোট নোট বুক বা মানিব্যাগ, একটা কাঠের চুড়ি ইত্যাদি খুব ছোট জিনিস ,কিন্তু আপনার কাছে কোন কারণে বেশ প্রিয়। কেন প্রিয় তা হয়তো তেমন মনে নেই। তবে  সেই ছোট্ট জিনিস টার মায়ায় আপনি খুব যত্নে রাখেন। ফলে এতোদিন পরও তা খুব সুন্দর আছে।

সম্পর্ক ঠিক এমনই, যত্নে রাখলে ভালো থাকে। প্রতিদিন যার সাথে সময় কাটবে, সে যদি আপনাকে একটু যত্ন করে তো আপনার মন এমনিতেই ভালো থাকবে । একইভাবে তাকেও যত্নে রাখলে বোঝাপড়া  ঠিক থাকবে।

এই তিন বিষয় যদি ঠিক থাকে, তাহলে দেখবেন সে যেমন ই হোক, তার সাথে কিছুটা পথ চলা যায়। পথ চলায় যদি পারস্পরিক বোঝা পড়া মজবুত হয়, তো মনে হবে এর সাথে চোখবন্ধ করে চলা যায়।

যার থেকে ধোকা পাওয়া র ভয় নেই। চাওয়া পাওয়া র বাড়াবাড়ির অশান্তি নেই। মানিয়ে চলার অতিরিক্ত ভার নেই। তার সাথে আর কিছু থাক না থাক, মানসিক শান্তি নিয়ে বাঁচা পযায়। কিছুদিন পর দেখবেন, সে আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কোন এক ফাল্গুনে তাকে অনায়েসে বলতে পারবেন “ভালোবাসি আমি তোমাকে”।

ভালোবাসা বিষয় টা আবেগ অনুভূতির একরকম ভারসাম্য। কখনওই একরকম থাকে না। তাই যাকে ভালোবাসেন তাকে নিয়ে শুধু ভালোবাসায় ভর করে সারাজীবন পার করা সম্ভব না। যদি না কিছু মানবিক গুনাবলী গুলোর সামঞ্জস্য না থাকে। তাই শুধু ভালোবাসা নয়, সাথে অন্যান্য গুণ গুলোও খুঁজে দেখুন বিয়ে নিয়ে ভাবার আগে।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *