গর্ভাবস্থায় মুড সুইং – এটা কি বাড়াবাড়ি ভাবনা ?

একজন গর্ভবতী মায়ের অনাগত সন্তান কেমন হবে তা নির্ভর করে মায়ের মন মানসিকতা কেমন যাচ্ছে তার ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের মন মানসিকতা যেমন থাকে তার অনুরূপ প্রভাব পড়ে বাচ্চার আচরণের ওপর।

মা যদি এই সময় হাসি খুশি থাকে, মনে আনন্দ নিয়ে দিন পার করে, তাহলে বাচ্চাও অনেক হাসি খুশি আর উৎফুল্ল আচরণের হয়ে থাকে। মা যদি বিষন্ন থাকে,উদ্দীগ্ন থাকে তাহলে বাচ্চাও কিছুটা ভীত ও অস্থির আচরণের হয়ে থাকে। এই সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চার আচরণে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। “ব্যক্তিত্ব বৈকল্যতা” সমস্যা দেখা দেয় ব্যক্তির মধ্যে। হীনমন্যতা, বিষন্নতা তাদের আচরণের নিয়মিত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থাৎ, শুধু মাত্র শারীরিক সুস্থতাই আমাদের একমাত্র কাম্য নয়। বাচ্চা যেন মানসিক ভাবেও সাবলীল হয় সে বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।

এরজন্য আমরা কি করতে পারি ?

গর্ভবতী মা কে মানসিক ভাবে স্থির রাখা: গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন হয়, এর প্রভাবে গর্ভবতী মায়ের মন মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। সে অকারণে মন খারাপ করে, অল্পতেই আতংকিত হয়। নানা রকম দু:শ্চিন্তা মাথায় আসে। যার কোন সঠিক কারণ সে নিজেও বলতে পারবে না। এই রকম অবস্থায় পরিবারে বাকি সদস্যদের উচিত তার সাথে সব সময় সুন্দর করে কথা বলা। তার কিছু প্রয়োজন কিনা, সে বিষয় জানতে চাওয়া। “তোমার কোন দরকার হলে আমাকে ডেকো” এই একটা লাইন বলে আপনি তার আস্থা অর্জন করতে পারেন। আর এতটুকু সাপোর্ট করা সবারই উচিত।

খাবার অরুচি: খাবার অরুচি, বমি হওয়া এসব  সাস্বাভাবিক। তবে পরিবারের মানুষের গর্ভবতীর খাবারের প্রতি উদাসীন হলে সেটা  অস্বাভাবিক। এসময় তার ঘন ঘন ক্ষুধা লাগবে, আবার অনেক খাবার খেতে ইচ্ছে করবে না। তখন সে খুব অসহায় হয়ে পড়ে যে, কি খাবে? কি খেলে ভালো লাগবে? কি খেতে চায়, কাকে বলবে?

এসময় বাড়ির অন্য সদস্য, বিশেষ করে যারা মা হয়েছেন তারা নিশ্চিত ভাবে তার সহায়তা করতে পারেন। তবে অবশ্যই তা আন্তরিকতা নিয়ে করবেন। “সব ই তো করছি, খেতে তো পারছে না”, “নতুন আর কি দেব, ঘরে যা আছে তাই তো খেয়েছি আমরা”, দায় সারা আচরণ এই সময় তাকে অন্তরমূখী করে তোলে। অযত্ন গুলো তাকে কষ্ট দেয়, অকারণে বেশি ভাবনায় ফেলে। যা গর্ভবতী ও সন্তান দুজনের জন্যই অস্বস্থিকর।

সংসারের কাজ কর্ম- ঘরের কাজ গুলো এই সময় পাহাড় সম ভারি মনে হয়। বিশেষ করে যাদের প্রথম প্রেগ্ন্যাসি তারা একটু বেশি অসুস্থ অনুভব করেন। কাজ কর্ম প্রেগ্ন্যাসি তে কখনই নিষেধ নয়। হ্যাঁ, ভারি কাজ গুলোর ক্ষেত্রে সতর্কতা বা নিষেধ থাকে। প্রথম তিন মাস অনেক সাবধান থাকতে হয়। ব্যাক্তি বিশেষে এই সাবধানতার ধরন,মাত্রা আলাদা। বাড়িতে অন্য সদস্য যারা আছেন, সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সহায়তা করলে বিষয় টা অনেক সহজ হয়ে যায়। এতে করে যিনি প্রেগন্যান্ট তার ওপর মানসিক চাপ কমবে। তাকে এই আশ্বস্ত করুন যে, সব ঠিক আছে, কোন অসুবিধা নেই। আমরা সবাই অ্যাডজাস্ট করে নেব তোমার জন্য। তুমি নিজের এবং বাচ্চার প্রতি মনযোগী হও।

স্বামীর সহায়তা-  স্বামী -স্ত্রী’র স্বাভাবিক জীবন প্রবাহ এ সময় বাঁধাগ্রস্থ হয়। স্বামী দেখছেন তার স্ত্রী প্রায় অসুস্থ থাকছেন। তার প্রতি খেয়াল দিতে পারছেন না। আবার, স্ত্রীর কিসে সুবিধা হবে? কি ভালো লাগছে বা মন্দ লাগছে তাও তিনি বুঝতে পারছেন না। নিজের কর্মস্থল, সাংসারিক দ্বায়িত্ব পালনের পর বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়তো গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন না। এজন্য স্ত্রী কে বাড়ির মহিলা সদস্য দের কাছে সোপর্দ করছেন বা মায়ের বাড়ি পাঠিয়ে দেন।  স্ত্রীর সুবিধা বিবেচনা করেই তিনি এ কাজ করেন, কিন্তু আপনার স্ত্রী এ সময় আপনাকেই কাছে চাইবেন সব সময়। আপনার পাশে থাকা, তাকে সময় দেওয়া, তার প্রতি মনোযোগী হওয়া আপনার অনাগত সন্তান ও স্ত্রী কে অনেক প্রফুল্ল রাখতে পারে। এতে করে আপনাদের পারিবারিক বন্ধন আরও মজবুত হবে।

অন্য দিকে যদি কোন হাজবেন্ড নেগেটিভ আচরণ করে, অবহেলা দেখায় এটা খুব খারাপ। এমন আচরণ কখনই কাম্য নয়। এই আচরণ একজন গর্ভবতী মায়ের মন মানসিকতা কে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে।

সর্বোপরি নিজের যত্ন- সব কিছুর পর যে  বিষয় টা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো নিজের ও সন্তানের জন্য কোনটা ভালো হবে তা নিজে বুঝতে পারার দক্ষতা একজন মেয়ের থাকা খুব জরুরি। যখন সে গর্ভবতী, তখন যেখানেই থাকুক আর যে পরিস্থিতিতেই থাকুক নিজের যত্ন, প্রয়োজন নিজেকে বুঝতে হবে। এমনকি মুড সুইং হলেও কিভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সে বিষয় বুঝতে হবে। তাহলে সে সব সময় ই উপকৃত হবে। পরনির্ভরশীল হতে হবে না। অসহায়ত্ব বোধ তাকে কাবু করবে না।

একটা নতুন প্রাণ সব সময় মূল্যবান। আপনাদের পরিবারে যখন একটা নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটবে, হোক সে কন্যা বা পুত্রবধূ বা নিকট আত্মীয় যত্ন করতে পিছপা হবেন না। নিজেদের ভেতর সম্পর্ক যেমনই হবে যখন একজন মেয়ে মা হতে যায়, তখন তার মাঝে নতুন এক মানব সত্ত্বার জন্ম হয়। সে মা হিসেবে নতুন করে দুনিয়া দেখতে শুরু করে। এই মুহূর্ত টা সবথেকে সুন্দর একটা মেয়ের জীবনে। আপনি তার সম্পর্কে যেই হোন না কেন, নিজের জায়গা থেকে তার জন্য ভালো কিছু করুন। কারণ, এই সময় সামান্য সাহায্য সহযোগিতাতেও  অনেক উপকার হয়। নতুন মা আর অনাগত সন্তানের চোখে অবশ্যই আপনি একজন আস্থাভাজন  ও সম্মানিত ব্যাক্তি হবেন।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *