বাচঁতে চাই,বাঁচতে দাও

ইদানীং ফেসবুকে প্রায়ই আত্মঘাতী পোস্ট, ভিডিও ইত্যাদি চোখে পড়ছে। কেউ লাইভে এসে কথা বলছে সুন্দর করে, তারপর সে আত্মঘাতী হয়েছে। পোস্ট দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, তারপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি অনলাইনে। জীবনকে কতটা হালকা ভাবে নিলে, এমন করা যায়?

গতদু’দিন আগে মনে হচ্ছিল, যারা আআত্মহত্যা করে তারা জীবন টাকে খুব হালকা ভাবে নিয়েছে। এজন্য এক পর্যায়ে এসে জীবনের গতি থেমে যায়। রাগ, দুঃখ, অভিমান সব কিছু একসাথে জমা হয়ে এমন একটা অসহনীয় অবস্থা তৈরি করে যে,……..।

 আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি এসব থেকে সেভ আছি। ভালো আছি ।আমার মনে অনেক জোর, কে কি বললো তাতে আমার তেমন কিছু যায় আসে না। নিজের ভালো থাকা টা নিশ্চিত করতে পারি। ঠিক তারপর দিনই পারিবারিক একটা  বিষয়ে,  হঠাৎ আমার খুব রাগ হলো । রেগে গেলে আমার খুব কান্না পায়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। মনে হয় কোথাও হারিয়ে যাই, দূরে কোথাও চলে যাই। আমার বাচ্চাকে নিয়ে সবার আড়ালে কোথাও লুকিয়ে থাকি। কাউকে দেখতে চাই না। চোখের সামনে কাউকে সহ্য হয় না। ইত্যাদি ইত্যাদি আরও অনেক কিছু, যা রাগ উঠলে মানুষের মাঝে চলে আসে।

তারপর একসময় ভাবছিলাম সেই মূহুর্ত টা নিয়ে। এই সময় একটা মানুষ বা আমার দ্বারা যে কোন রকমের ভুল কাজ করা সম্ভব। কিছু না হলেও স্টোক করে অঘটন ঘটাও খুব সম্ভব। এই সময় গুলোতে কি হতে পারে আমার সাথে?  পরিবারের মানুষ গুলো কি করতে পারে??  এমন সময় যদি ভবিষ্যতে আবারও আসে তখন কি হবে?!

উত্তর গুলো আমারও জানা নেই। অনেক প্রশ্ন আছে। এজন্যই আজকে এই লিখা।

রাগ খুব ভয়ংকর রুপ নেয় বয়স, পরিস্থিতি এবং ব্যক্তি বিশেষে। একজন ছোট বাচ্চা ভয়ংকর রেগে গেলে আরেক বাচ্চাকে বা আপনজনকে যেয়ে আঘাত করে। বড় মানুষ রেগে গেলে তা সংবরণ করে বা হয়তো অনেক সময় অসুস্থ হয়ে যায়। এরথেকেও খারাপ কিছু হওয়া থেকে আল্লাহ হেফাজত করুন। টিনএজ দের রাগ গুলো খুব খারাপ পরিণতি র দিকে যায়। কারণ, তারা শুধু চাপের মধ্যেই পড়ে, কাউকে বলার সুযোগ তাদের নেই। ফলাফল, এমন কিছু যা আমরা চাই না। এই পরিস্থিতি গুলো কি আপনার পরিবারে সৃষ্টি হয়? আপনি তখন কি করেন? কখনও কি অস্থির মানুষ টাকে বলেছেন তুমি একটু বসো। পানি খাও, সব শুনছি।

এই “সব শুনছি”, “বসো, বসে কথা বলো”, “ শান্ত হও” এই কথা গুলো রেগে যাওয়া মানুষটাকে  কিছুটা শান্ত করতে পারে। তাকে একটু ভরসা দিতে পারে যে, এখানে তাকে বোঝার মতো কেউ আছে। সবই তার বিপক্ষে নয়।

এতে করে পরিস্থিতি শান্ত হতে পারে। একটা বিষয় কি জানেন, বেশির ভাগ মানুষ ই একটু কথা বলার জায়গা খোঁজে। নিজের একটু জায়গা খোঁজে। তার মতো করে কথা বলতে চায়, ভাবতে চায়, কাজ করতে চায়। তার কোন কাজ কে সবাই একটু বাহবা দিক, তার একটা সম্মানের জায়গা থাকুক, এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। অন্যায় তো কিছু নয়। যখনই স্বাভাবিক ভাবে এগিয়ে যাওয়ার পথে বারবার হোঁচট আসে, তখন একটু একটু করে অস্থিরতা দানা বাঁধে। হতে পারে ব্যাক্তি নিজে অনেকটা দূর্বল, যা আশা করছে তার থেকে তার কাজের গতি অনেক পিছিয়ে।  আবার, উল্টো টাও হয়। যেমন,  সে যদি বেশ প্রশংসনীয় হয় তো তার একটা প্রতিপক্ষ তৈরি হবে। যে তাকে তার জায়গায় পৌছাতে দেবে না বা নিজের জায়গা ছাড়বে না। এই সব জগৎ -সাংসারিক কারণে একটু একটু করে এক রকম ঘোলাটে অবস্থার সৃষ্টি হয় সংসারে।

রাগ, অভিমান বা উচ্চস্বরে চিৎকার করলেই ধরা হয় তার আচরণের অবক্ষয় হয়েছে। হ্যাঁ, আচরণের অবক্ষয় তো বটেই। তবে একটা বিষয় কি, এই কাজ গুলো যখন কেউ করে অনেক নিরুপায় হয়ে করে। আপনার টিনএজ বাচ্চা, উঠতি বয়সী ভাই-বোন বা আপনার হাজবেন্ড বা ওয়াইফ যখন তার অসুবিধার কথা, সমস্যার কথা বা কোন একটা ভালো না লাগার  কথা হাজার বার বোঝাতে চেয়েও যখন পারে না, তখন এমন আচরণের সৃষ্টি হয়।

এই আচরণ গুলো যখন আমাদের সামনে বা আশেপাশে দেখি, তখন প্রথমেই তার গুষ্টি উদ্ধারে নেমে পরি সবাই মিলে। হতে পারে সে আপনার অধীনস্থ, হতে পারে সে আপনার পরিবারের সদস্য বা একান্ত আপন মানুষ স্ত্রী, সন্তান বা ভাই-বোন। এককথায় কিছুটা দুর্বল অবস্থানের মানুষ। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, কান্নায় ভেঙে পড়া, কারোও ওপর চিৎকার চেঁচামেচি করা, এগুলো এক অর্থে দূর্বল মানসিকতার মানুষেরই লক্ষণ। এজন্যই তারা প্রায় প্রায় চাপের মুখে পড়ে, বলতে পারে না সহজে। নির্ভরশীল থাকে সব সময় অন্যের ওপর । বারবার নিজেকে সামলে নিতে নিতে যখন আর পারে না, তখন এক রকম মানসিক ভাবে  বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

মানসিক বিপর্যয় থেকেই সৃষ্টি হয় হতাশা, হীনমন্যতা, লোকচক্ষু র অন্তরালে লুকিয়ে থাকা, কথা কম বলা,  কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলা বা কনফিডেন্স লোপ পাওয়া, অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার প্রবণতা বেড়ে যায়। এই মানুষ গুলো একদিকে খুব অসহায়। আবার সমাজ এদের প্রতি খুব বিরূপ। কারণ, এদের থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।

এজন্যই কি আমরা একটু দূর্বল চিত্তের মানুষের ওপর চেপে বসি? যেন দম না নিতে পারে?  বাধ্য করি, যেন হারিয়ে যায় নিজ ইচ্ছায়?

কোন মানুষের আচরণের পরিবর্তন কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। অনেক দিনের কোন মানসিক সংঘর্ষের ফলাফল। মনে হচ্ছে আমি যেন কোন প্রতিযোগিতার কথা বলছি, তাই তো! এই পৃথিবী’তে  কোন কিছুই এখন আর প্রতিযোগিতার বাইরে নয়। সবাই প্রতিযোগি আর সব কিছুতেই প্রতিযোগিতা। এই চিৎকার চেঁচামেচি করা, হুট হাট রেগে যাওয়া বা অস্থিরতা, প্রেশার কম বেশি হওয়া, অসুস্থ হয়ে পড়া  কোন কিছুই একদিনের ফলাফল নয়। পরিস্থিতি জটিল হবার আগে একটু সময় দিন আপনজন কে। এক রোখা চালচলন কখনোই কোন সমাধান নয়।

নয়তো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা গুলো বারবার দেখতে হবে। মনের অজান্তেই ভাবনা গুলো এসে যাবে। সুস্থ স্বাভাবিক মন ও মস্তিষ্কেও অশান্তির ঝাপটা লাগবে। আসে পাশের অনেক ভীরু সরল চোখ গুলো হয়তো বোবা সাংকেতিক ভাষায় বারবার বলে “বাচঁতে চাই, বাঁচতে দাও”।

কথায় বলে মানুষের সংসারে একটা কাঠিও ফেলনা নয়,তারও কিছু না কিছু কাজ আছে। আল্লাহ’র দুনিয়াতে মানুষ কি করে ফেলনা হয়! যে কথায় কথায় জীবন উচ্ছেদ করে ফেলে??

যে যার যার অবস্থান থেকে নিজের ও পরিবারের  মানসিক শান্তি নিশ্চিত করা খুব জরুরি। আর্থিক অসচ্ছলতা নিয়েও স্বাভাবিক ভাবে  বাঁচা যায়, কিন্তু মানসিক অশান্তি নিয়ে চলা যায় না। সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকা যায় না। সব মানুষের এটা অনুধাবন করাও খুব জরুরি।  

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *