গরমে বাচ্চাদের ৪ টি রোগ নিয়ে সতর্ক থাকুন

গরমের এই মৌসুমে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাধুর্য যেমন বেড়ে যায়, তেমনই বাড়তে থাকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। বাচ্চাদের নিয়ে প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। এই আর্টিকেলে গরমের সময় বাচ্চাদের ৪ টি রোগ নিয়ে জানানোর চেষ্টা করবো।
১. ডায়রিয়া
২. নিউমোনিয়া
৩. স্ক্যাবিস
৪. ঘামাচি এবং অন্যান্য।

একটা মূল কথা হলো, আমাদের দেশে যেভাবে আবহাওয়া পরিবর্তন হয়, তাতে কোন সময় ই বাচ্চারা পরিপূর্ণ ঝুঁকিহীন নয়। তবে যত্নে রাখলে এই অসুখ গুলো এড়ানো জটিল কিছু নয়।

ডায়রিয়া এবং নিউমোনিয়া :
প্রায় সারাবছর ই বাচ্চাদের এই দুই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।কারণ, রোগের প্রধান কারণ, জীবাণু /ছত্রাক। যা গরমের সময় অনেক বেড়ে যায়। বাসি খাবার বা অস্বাস্থ্যকর খাবার। অনিরাপদ খাবার পানি এবং অপরিচ্ছন্ন থাকলে এই রোগ গুলো খুব দ্রুত ছড়ায়। আর বাচ্চা সহ বড়দের জন্যও বিষয় টা খুব ঝুঁকিপূর্ণ।
বড় রা নিজেদের ভালোমন্দ বোঝে, নিজের খেয়াল নিজে রাখতে পারে। কিন্তু, বাচ্চা রা তো সেটা পারে না। তাই বাচ্চাদের বিষয়ে মা বাবা এবং বাড়ির অন্য সদস্য সকলেই সচেতন থাকতে হবে।

ডায়রিয়ার সতর্কতা :
ডায়রিয়া থেকে দূরে থাকতে কিছু টিপস অনুসরণ করতে পারেন –
• নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। বাচ্চা ১+ বয়সের হলে সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠার পর ওর হাত মুখ ধোয়ার পাশাপাশি, সারাদিন যখন ও খেলাধুলা শেষ করছে বা খাবার খেতে বসছে হাত ধুয়ে দিন। আপনি যদি বাচ্চার পরিচর্যাকারী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি ও নিজের হাত সব সময় পরিষ্কার রাখুন।
• নিয়মিত গোসল করানো। ছোট বাচ্চার নিয়মিত গোসলের দরকার নাই, এটা খুব ভুল একটা ধারণা। এখন চিকিৎসক রাও সব সময় উপদেশ দিয়ে থাকেন, বাচ্চাকে নিয়মিত গোসল করানোর জন্য। ডায়রিয়া, নিয়মোনিয়া, স্ক্যাবিস বা অন্যান্য চর্ম রোগ যেহেতু ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং পরজীবি র মাধ্যমে ছড়ায়, তাই পরিচ্ছন্ন থাকা খুব জরুরি।
• খাবারের বিষয়ে সতর্কতা। বাইরের যে কোন রকম খাবার থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখুন। খুব ভয়ংকর ভাবে এই খাবার গুলো থেকেই যত সমস্যার শুরু হয়।
• বাড়িতে খাবার গুলো যত্নের সাথে সংরক্ষণ করুন। যেমন : গরমের সময় কিন্তু এ বেলার রান্না, পরের বেলা তেই নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে ডাল এবং কিছু কিছু সবজির তরকারি রান্নার পরে খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়। এজন্য বাচ্চাকে খাবার খাওয়ানোর ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হবেন, যে ওর খাবার টা যেন বাসি না হয়।
• ফ্রিজে খাবার রাখা তে কোন সমস্যা নেই, তবে ফ্রিজ খুব পরিষ্কার রাখা এবং খাবার ঠিক মতো সংরক্ষণ করা খুব জরুরি। ফ্রিজের খাবার পরিবেশনের আগে ঠিক মতো গরম করে নিবেন।
• ঘরদোর রেগুলার পরিষ্কার রাখবেন।

ডায়রিয়া হলে ঘরোয়া চিকিৎসা :
খাবার স্যালাইন এর প্রধান ও একমাত্র সমাধান। যখনই শিশু বারবার পাতলা পায়খানা বা বার বার বমি করবে, তখনই আগে তাকে স্যালাইন দেওয়া শুরু করবেন। পানির মাপ নির্দিষ্ট রেখে এবং প্যাকেটে র মেয়াদ দেখে নেবেন। বাড়িতে বানালেও, মাপ ঠিক রাখবেন। অনেক সময় পেটের সমস্যা হলেও একাধিক বার পটি হয় বা পেটা মোচড় দিয়ে পটি হয়। সেক্ষেত্রে ও প্রাথমিক চিকিৎসা খাবার স্যালাইন শুরু করুন। এরপর, যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসক এর পরামর্শ নিন।
বারবার পয়াখানা বা বমি যে পানির সল্পতা সৃষ্টি করে, সেটাই বাচ্চাকে ঝুঁকি র দিকে ঠেলে দেয়। এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য শুরু থেকেই স্যালাইন গ্রহণ করলে, বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো কষ্ট পোয়াতে হবে না হয়তো।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ালে সুস্থতা বাড়িতেও সম্ভব।
নিউমোনিয়া থেকে সতর্কতা: প্রাথমিক সতর্কতা হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা। তাই বলে দিনে ২/৩ বার গোসল বা লম্বা সময় পানিতে কাটানো নয়। এতে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে।
মূলত নিয়মোনিয়া ফুসফুস কে আক্রান্ত করে। ফলে শ্বাসকষ্ট হয়। এই রোগ যদিও ঠান্ডা লাগা থেকে হয়। তবে পরোক্ষ ভূমিকা রাখে ব্যাকটেরিয়া / ছত্রাক। যা আপনার ফুসফুসে আক্রমণ করে এবং দূর্বল করে দেয়।
বাচ্চার জন্য সতর্কতার ধাপ গুলো –
• ধুলাবালি পরিহার করে চলা। প্রয়োজনে ৫+ বয়সী বাচ্চাকে রাস্তায় চলাফেরা র সময় মাস্ক ব্যবহার করানো।
• জন সমাগম বেশি, এমন জায়গা থেকে এই গরমের সময় রোগ বালাই ছাড়ায় বেশি। যেমন – মানুষের হাঁচি কাশি, ঘামে ভেজা হাত ইত্যাদি থেকে। তাই বাচ্চাকে এমন ভিড় থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখুন।
• স্কুল বা খেলার মাঠ থেকে ফিরে নিয়মিত গোসল ও পরিষ্কার হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
• খুব রোদ এবং গরমের থেকে ফিরে সরাসরি এসি বা ফুল স্পীড ফ্যানের নিচে বসা, ফ্রিজে র ঠান্ডা পানি খাওয়া থেকে সাবধান। একই রকম ভাবে বাচ্চা স্কুল থেকে বেরিয়ে প্রচন্ড গরমের মধ্যে আইস্ক্রীম বা ঠান্ডা পানীয় জাতীয় কিছু খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখুন। মূলত এভাবেই ঠাণ্ডা লাগার সূত্রপাত হয়।
• খালি শরীরে বাচ্চাকে সরাসরি ফ্যান বা এসি র নিচে রাখবেন না।

চিকিৎসা : বাচ্চা যদি ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে ডায়রিয়া র মতো কোন ঘরোয়া ট্রিটমেন্ট নেই। প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এরপর প্রয়োজন মাফিক ঘরে যত্ন নিন। ঠান্ডা থেকে দূরে রাখুন।
প্রথমেই ঠান্ডা ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে না। সঠিক যত্ন ও পরিচর্যা না হলে, তখন তা ভয়ংকর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
স্ক্যাবিস: ছোঁয়াচে চর্ম রোগ। মূলত এক পরজীবি র সংক্রমণের ফলেই এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। উকুন যেমন একটি পরজীবি তেমন ই সারকোপ্টিক স্ক্যাবিয়া নামক এক অণুবীক্ষণিক পরজীবি র মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। আঞ্চলিক ভাষায় একে খোস পাঁচড়া বলা হয়। যা হাত, পা য়ের আঙুলের ভাজে ভাজে, শরীরে র বিভিন্ন জায়গায় ভাজে ভাজে ছোট ছোট ফুসকুড়ি র মতো দেখা দেয়। এগুলো প্রচন্ড চুলকায়, এ থেকে কস বের হয়, অনেক সময় পুঁজ হয়ে যায়।
কারণ : গরম যখন বেড়ে যায়, তখনই এই পরজীবির সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। এই বছর রাজশাহী এবং খুলনা এই দুই শহরে এই সংক্রমণ বেড়ে গেছে। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এ খবর নিশ্চিত করেছেন যে, প্রায় প্রতিদিন ই স্ক্যাবিস এ আক্রান্ত রোগী আসছে এবং দিন দিন যেন সংক্রমণ বেড়ে ই যাচ্ছে।
তবে শুধু স্ক্যাবিস আক্রান্ত হয়ে নয়, বরং অন্যান্য রোগের সাথে স্ক্যাবিস নিয়ে আসছে রোগীরা। অনেক ক্ষেত্রে তারা জানেন ও না যে, এই রোগ এর প্রাদুর্ভাব কতটা ভোগান্তি তে ফেলতে পারে।
নিরাময় ও সতর্কতা : যেহেতু এই রোগ ছোঁয়াচে তাই, আক্রান্ত ব্যাক্তির থেকে দূরে থাকা এবং সংক্রমিত এলাকা বা বাসা বাড়ি থেকে দূরে থাকা ই প্রথম সতর্কতা।
এছাড়াও বাইরে থেকে বাড়ি ফেরার পর, বিশেষ করে খেলার মাঠ, স্কুল বা বাজার থেকে ফেরার পর গোসল দেওয়া খুব ভালো অভ্যাস। তা না হলেও ভালো মতো হাত পা ধুয়ে ফেলুন। বাচ্চাকে ও একই ভাবে যত্ন নিন।
স্ক্যাবিস আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গুলো নিয়মিত ব্যবহার, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা দ্রুত রোগ সারাতে পারে। আর বাড়ির অন্যান্য সদস্য রোগী থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন।
ঘামাচি ও অন্যান্য রোগ: গরমের মধ্যে খুব কমন অসুখ গুলো র মধ্যে পড়ে জ্বর, ঠান্ডা লেগে গলা ব্যাথা বা মামস ফুলে যাওয়া, এলার্জি বেড়ে যাওয়া, ঘামাচি, ইত্যাদি।
সতর্কতা : এই গরমে যা যা রোগ হয় তার সবগুলো র ই উৎস গরমের ঘাম, প্রচন্ড গরমের মধ্যে ঠান্ডা আইস্ক্রীম খাওয়া, বা ঠান্ডা পানি বা জুস/শরবত এ জাতীয় কিছু খাওয়া।
ঠিক মতো পরিচ্ছন্ন না থাকা। এই অসুর গুলো ছোট বাচ্চা এবং বড়দের সমান ভাবে আক্রান্ত করে। যার ফলে সুস্থ একটা দিন পার করার পর হঠাৎ করে সন্ধ্যা থেকে মনে হতে পারে গা হাত পা ব্যাথা করছে। প্রচন্ড মাথা ব্যাথা, সাথে জ্বর চলে আসলো।
২/৪ দিন বেশ কষ্ট হবে। অবহেলা করবেন না। নয়তো ভোগান্তি আরও বেড়ে যাবে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া র জন্য আমাদের দেশে ছোট ছোট এই রোগ বালাই গুলো লাগেই থাকে। তবে ঘরে থেকেই এই অসুখ গুলোর চিকিৎসা ও নিরাময় সম্ভব। এজন্য সতর্কতা জরুরি।
রোগের ব্যাপারে নিজে থেকেই বিস্তারিত জানুন, নিজের, বাচ্চার এবং পরিবারের যত্ন নিন। সুস্থ থাকুন।

Share

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *